১১ জানুয়ারী: ঐতিহাসিক মক্কা বিজয় দিবস (ইংরেজি সাল অনুযায়ী)

ষষ্ঠ হিজরি সনের জ্বিলকদ মাস। রাসুল (সাঃ) তখন মদিনায়। এক রাতে তিনি স্বপ্ন দেখলেন, সাহাবীদের নিয়ে মক্কায় উমরা পালন করছেন। এর কিছুদিন পর রাসূল (সাঃ) চৌদ্দশ সাহাবী ও কুরবানীযোগ্য পশু নিয়ে মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা হন পবিত্র হজ্জ পালনের জন্যে।
মুসলিমরা মক্কায় আসছে এ খবর ছড়িয়ে যায় চারদিকে। এতে চিন্তায় পড়ে মক্কার কোরেশগন। তারা ৩০০ সদস্যের একটি দল প্রেরণ করে পথিমধ্যে মুসলিম বাহিনীকে বাধা দেওয়ার জন্য। সেই বাহিনীর দায়িত্বে ছিলেন খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা) (তিনি তখনও ইসলাম গ্রহণ করেননি)।

কিন্তু রাসুল (সাঃ) কোন রক্তপাত চাননি, তিনি যুদ্ধ এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করেন। ঝামেলা এড়াতে বিকল্প পথে মক্কায় প্রবেশ করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু খালিদ (রা)- কে এড়িয়ে যাওয়াও সম্ভব হচ্ছিল না। মক্কা থেকে ১৩ মাইল দূরে হুদাইবিয়ার প্রান্তরে ক্যাম্প করে মুসলিম বাহিনী। এর মাঝে প্রাণনাশ ছাড়াই কোরেশগনের সাথে কিছু খণ্ড যুদ্ধ সংঘটিত হয়। একসময় দু’পক্ষ একটি চুক্তিতে পৌঁছায়, যা বিখ্যাত হুদাইবিয়ার সন্ধি নামে পরিচিত।

এই চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ একটি পয়েন্ট ছিল, আশেপাশের অন্য যেকোন গোত্রও চাইলে কোরেশ কিংবা মুসলিমদের পক্ষে যোগ দিতে পারবে। খোজা গোত্র মুসলিমদের পক্ষে আর বনী বকর কোরেশদের পক্ষে যোগ দেয়। ফলে এই গোত্র দু’টি হুদাইবিয়া চুক্তির আওতায় চলে আসে।
খোজা ও বনী বকর গোত্র রাসূল (সাঃ)- এর পূর্বযুগ থেকেই দীর্ঘ সময় ধরে সংঘর্ষে জড়িয়ে ছিল। হুদাইবিয়ার চুক্তির ফলে তাদের মধ্যে শান্তি বজায় থাকার সম্ভাবনা তৈরী হয়। কিন্তু ২ বছর পরই বনী বকর খোজা গোত্রকে কোরেশদের সহায়তা নিয়ে আক্রমণ করে। মিত্র হিসেবে খোজা গোত্র রাসূল (সাঃ)- এর নিকট চুক্তি ভঙ্গের বিষয়টি জানায় এবং সাহায্যের আবেদন করে।

কোরেশদের প্রভাবশালী নেতা আবু সুফিয়ান চুক্তি ভঙ্গের ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন না। এবং বনী বকর গোত্রের আক্রমণের ব্যাপারে কিছুই জানতেন না। ফলে তিনি মদিনায় ছুটে যান রাসুল (সাঃ) কে বুঝিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে। কারণ সুফিয়ান জানতেন এবার মুসলিমরা মক্কা আক্রমণ করলে অত্যাচারী কোরেশদের আর রক্ষা নেই। কিন্তু তাকে একরকম আশাহত হয়েই মক্কায় ফিরে আসতে হয়। এদিকে রাসুল (সাঃ) দ্রুত বাহিনী তৈরী করতে বলেন। শীঘ্রই শুরু হয় যুদ্ধের প্রস্তুতি। ৮ হিজরি সনের ১০ই রমজান (৬৩০ খ্রিঃ ১ই জানুয়ারী) মুসলিম বাহিনী মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা হয়।

মুসলিম বাহিনী যখন মক্কার দশ মাইলের ভেতর প্রবেশ করে অবস্থান নেয় তখন মোট সৈন্য সংখ্যা দাঁড়ায় ১০ হাজারে। যা ছিল পূর্বের অভিযান গুলোর তুলনায় বেশি। আবু সুফিয়ান আবারও রাসুল (সাঃ)- এর নিকট আসে। কারণ সে বুঝতে পেরেছিল কোরেশগন যদি প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করে তবে তাদের ধ্বংস অনিবার্য। সুফিয়ান যখন রাসূল (সাঃ)- এর কাছে আসে তিনি জিগ্যেস করেন, ” আবু সুফিয়ান তুমি জানো না, আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই। তুমি কি জানো না? আমি আল্লাহ’তায়ালার রাসূল?” এই প্রশ্নের উত্তরে প্রথমে সুফিয়ান বলে, এ ব্যাপারে তার সন্দেহ রয়েছে। পরে আবার পরিস্থিতির ভয়াবহতা চিন্তা করে স্বীকার করে নেয়, আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই এবং হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) আল্লাহর প্রেরিত বান্দা ও রাসূল।

রাসূল (সাঃ) সুফিয়ানের কাকুতি-মিনতিতে এই নিশ্চয়তা দেন যে, আবু সুফিয়ানকে আক্রমণ করা হবে না, তার ঘরে যে থাকবে সেও নিরাপদ। আবার যাদের ঘরের দরজা বন্ধ থাকবে তাদেরও কোন ভয় নেই।আবু সুফিয়ান ফিরে যায়। মুসলিম বাহিনীও মক্কার দিকে আগ্রসর হয়। এত বিশাল বাহিনীর সামনে আসতে সাহস করেনি মক্কার অমুসলিমরা। একরকম বাধা ছাড়াই মুসলিম বাহিনী মক্কা বিজয় করে নেয়। যদিও খালিদ বিন ওয়ালিদ (রাঃ)- এর সেক্টরে কিছুটা খণ্ড যুদ্ধ হয়েছিল। তবে সেটাও কোরেশরা প্রথমে আক্রমণ করেছিল বলে।

১১ জানুয়ারী ৬৩০ খ্রিঃ রাসূল (সাঃ) মক্কায় প্রবেশ করলেন। সেই মক্কায়! যেখান থেকে একসময় পালিয়ে মদিনায় হিজরত করতে হয়েছিল। আজ তিনিই মক্কা নগরীর শাসক, তিনিই নিয়ন্ত্রক। তিনি চাইলে কচুকাটা করতে পারেন প্রত্যেকটা অত্যাচারী অমুসলিমকে। কিন্তু তিনি কিছুই করলেন না! প্রথমেই কাবা প্রদক্ষিণ করলেন সাত বার। এরপর কোরেশদের জিগ্যেস করলেন, ” হে কোরেশগন তোমরা আমার নিকট কিরূপ আচরণ আশা করো?” কোরেশরা বললো, “দয়ালু আচরণ, হে মহান ভ্রাতা ও ভ্রাতার পুত্র” এরপর রাসূল (সাঃ) বললেন “তোমাদের প্রতি আমার কোন অভিযোগ নেই, তোমরা মুক্ত” পৃথিবীর ইতিহাসে রচিত হলো এক অনন্য ক্ষমার দৃষ্টান্ত। উপস্থিত সবাই বাকরুদ্ধ হয়ে গেলো, কেউ লজ্জায় মাথা নিচু করলো, আবার কেউ অবাক বিষ্ময়ে ভাবতে লাগল, এতটাও ক্ষমাশীল কেউ হয়!

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *