স্পেনের এই দ্বীপের অধিবাসীরা খুব অদ্ভুত এক কাজ করে

আচ্ছা, আপনি কি স্পেনের লা গোমেরা দ্বীপের নাম শুনেছেন? এই দ্বীপের অধিবাসীরা খুব অদ্ভুত এক কাজ করে থাকে। তারা আমাদের মতো কথা বলে যেমন একে অপরের সাথে যোগাযোগ করে, তেমনই পাখির মতো শিস বাজিয়েও একে অপরের সাথে যোগাযোগের বিচিত্র এক উপায়ের জন্ম দিয়েছে!

গোমেরার স্থানীয় অধিবাসীদের বলা হয় গুয়াঞ্চে। এই গুয়াঞ্চেরা নিজেদের মাঝে যোগাযোগের জন্য যে শিস-ভাষার প্রচলন করেছে, তা সিল্‌বো গোমেরো (গোমেরার শিস) কিংবা এল সিল্‌বো (শিস) ভাষা নামে পরিচিত। তবে এখানে বলে রাখা ভাল, তারা কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো ভাষার উদ্ভাবন করেনি, বরং স্প্যানিশ ভাষাকেই কথ্য রূপের পরিবর্তে শিসের রুপ দিয়েছে।

দুটো ভিন্ন শিস স্প্যানিশ স্বরবর্ণ আর চারটি ভিন্ন শিস স্প্যানিশ ব্যঞ্জনবর্ণগুলোর বদলে ব্যবহৃত হচ্ছে। মাত্র ছয় ধরনের শিস দিয়ে কীভাবে তারা মনের ভাব প্রকাশ করে? এখানে মাত্র ছ’ধরনের শিসের কথা বলা হলেও সেসবের তীক্ষ্মতা, একটানা বাজানো হচ্ছে নাকি বিরতি দিয়ে বাজানো হচ্ছে এমন বিষয়াদির উপর ভিত্তি করে শিসগুলোকে আলাদা করা হয়। ফলে সেভাবেই তাদের মনের ভাবের পরিবর্তনও বোঝা যায়।

কেবলমাত্র সাধারণ পরিস্থিতিতেই না, বরঞ্চ শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দ্বীপের অধিবাসীদের কাছে সতর্কবার্তা পৌঁছে দিতে ব্যবহৃত হয়েছে এই শিস। সেই ইতিহাস জানতে ফেরত যেতে হবে গত শতাব্দীর ত্রিশ থেকে পঞ্চাশের দশকের মধ্যবর্তী সময়ে। সেই সময়ে মাঝে মাঝেই স্পেনের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এই অঞ্চলের লোকদের ট্রাকে তুলে নিয়ে দাবানল নেভানোর কাজে লাগিয়ে দিত!

স্থানীয় কেউই স্বেচ্ছায় এই কাজ করত না, বরং তাদের ধরে নেয়া হয়েছে বলেই করত। এই ঝুঁকিপূর্ণ ও পরিশ্রমসাধ্য কাজ করেও বিন্দুমাত্র মজুরি জুটত না কপালে, কেননা আগেই সেটা উপর মহলের লোকজনের মাঝে ভাগাভাগি হয়ে যেত। তাই তো এই শিসকেই একসময় লা গোমেরার অধিবাসীরা বেছে নেয় প্রতিরোধের একমাত্র মাধ্যম হিসেবে।

যখনই পুলিশের গাড়ি আসতে দেখত, তখনই বিশেষ শিস-ভাষার মাধ্যমে অন্যদের সতর্ক করে দিত তারা। চিৎকার করলে গলার স্বর যতদূর যাবে, শিস এর চেয়ে আরও অনেক দূর যেতে সক্ষম। ফলে সেই বার্তা শুনে মানুষজন পালিয়ে যেত, পুলিশ এসে আর বিনা মজুরিতে খাটার লোক না পেয়ে চলে যেত।

পঞ্চাশের দশকের শেষের দিক থেকেই এই শিস-ভাষার কপালে শনি ভর করে। অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ হয়ে যাওয়ায় স্থানীয়দের অনেকেই আশেপাশের অন্যান্য অঞ্চল, এমনকি অন্য দেশেও চলে যায়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতির ফলে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ভাল হলো, হাতে এলো মোবাইল ফোনও। ফলে শিস দিয়ে আর মনের ভাব প্রকাশ করা লাগে না। কয়েকটা বাটন টিপেই সেরে ফেলা যায় দরকারি যত আলাপ।

এভাবে গত শতকের শেষের দিকে এসে এককালের জনপ্রিয় এই যোগাযোগ মাধ্যম বিপন্ন ভাষার তালিকায় নাম তোলে। অবশেষে টনক নড়ে সরকারের। ১৯৯৯ সাল থেকে লা গোমেরা দ্বীপের স্কুলগুলোতে এই ভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়। ২০০৯ সালে ইউনেস্কো তার Intangible Cultural Heritage of Humanity-র তালিকায় স্থান দেয় এই ভাষাকে। এভাবেই বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পাবার সাথে সাথে উচ্চ মর্যাদার আসনেও প্রতিষ্ঠিত হয় এই ভাষা।

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *