মনে হইলো, কয়েক শ’ বছরের পেছনের জীবনযাত্রা দেখে ফিরলাম

সারাদিনের বাসে যাত্রা শেষে নৌকাযোগে উঠলাম আলীকদম থেকে দুসরি বাজার। বাজার করে ফেলতে হইছে আলীকদমেই। পাড়াতে নিজেদের রান্না করেই খেতে হবে। হাঁটতে হাঁটতে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত। আমরা হাঁটছি তো হাঁটছি ই ফোনের মৃদু ফ্ল্যাশের আলোয়। হঠাৎ সবাই দু’ পাশে ঝিরি, মাঝের পাথুরে শুকনো মাটিতে বসে পরলাম। ফ্ল্যাশ বন্ধ করতেই এক আকাশের লক্ষ্যাধিক তারা দেখি ঝাঁপি মেলে ধরছে ছাতার মতন। ছোট্ট ঈদের চাঁদ ঐ দূরে আমাদের নিমন্ত্রণ জানালো নেটওয়ার্কবিহীন গাঢ় সবুজের পাহাড়ে।

এর আগে খন্ড খন্ড সুযোগে দেখা হইছিলো চাকমা, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা ও বম জনগোষ্ঠীর জীবন দেখার। এবার দেখবো মুরং জনগোষ্ঠীর৷হীম শীতল বাতাসে পাহাড়, ঝিরি পেছনে ফেলে একটা সময় নিজেদের নিয়ে উঠলাম অচেনা এক মুরং পরিবারের ঘরে৷ হাঁড় কাপনো হীম পানিতে হাত মুখ ধুয়ে চল্লো রাতের খাবারের যোগাড় যন্ত্র। বাঁশের চাটাই এ গড়া ঘরে ভাংগা অংশ গলে হু-হু করে ঢুকতেছিলো পাহাড়ি ঠান্ডা। আড্ডা শেষে এক লাইনে পাশাপাশি শুয়ে কম্বল, শতরঞ্জি আর মুরং জনগোষ্ঠীর নিজেদের বুননে শীতলপাটিতে আগলে ধরলাম নিজেদের৷সকালে উঠতেই মন ভরে গেলো নিজেদের দেখে। ফুটফুটে আলোয় নিজেদের আবিষ্কার করলাম ‘মেনকিউ পাড়ায়’। পাহাড়ের ভাঁজে ছিমছাম গোছানো এ পাড়ার পাশে দিয়েই বয়ে যাচ্ছে অবিরত অকৃত্রিম ঝিরি- মৃদু তালে। ঘোর লেগে যায় ঝিরির এ শব্দে। প্রাকৃতিক এক আদুরে মায়া-মায়া পরিবেশে এ সম্প্রদায় বাস করেন বছরের পর বছর।

শুনলাম এখানে কোন ওয়াসরুম নেই। প্রাতঃক্রিয়ায় এখানে ভরসা পাহাড়ের ঢাল এবং শুকরে। বিষয়টা বুঝতে দেরী হইলো খানিকক্ষণ। খানিক পরে নিজেরে দেখলাম ঝিরি ধরে আগায় যাচ্ছি, হাতে ফাঁকা পানির বোতল। ঝিরি থেকে পানি ভরে ঢুকে গেলাম এক পাহাড়ের ঢালে অবিরত সবুজে। গুল্ম গাছ এদিক-সেদিক সরায়ে নিজের বসায় মতন একটা জায়গা করে নিলাম। শেষে উঠে আসতেই একদল শূকর ছানা সেরে নিলো তাদের সকালের আহার।

এখানের নিত্যদিন শুরু হয় ঘরের সামনে বাঁশ, কাঠের আগুন তাপানো দিয়ে। পরিবারের বড়-ছোট-বুড়ো সদস্যের পর নিজেদের উষ্ণ করে নেয় কুকুর, শূকর ও গয়াল পরিবার। পাহাড়ের কুকুরছানাগুলা বেশি আদুরে।শীতের সকালের শরীর জমে থাকা ভাব কাটায়ে উঠতেই এরা লেগে পরে নিত্যদিনের কাজে। বাজারের জন্যে এ মানুষগুলো ৪-৬ ঘন্টা হেঁটে যায় সেই দূরের আলীকদম বাজারে। এরা গয়াল পালে।সুযোগ আসলো গয়ালের গোস খাবার। কিন্তু সবকিছু মিলায়ে আর সুযোগ হইলো না খাওয়া। হাঁইটা রওনা হলাম আমাদের পরবর্তী মুরং জংষ্ঠির ‘মেনকিং পাড়া’ র উদ্দেশ্যে।

ঝিরি ফেলে, বিশাল পাহাড় ডিঙ্গায়ে যখন হাঁফ ছেড়ে বসলাম তখন আমাদের থেকে পাড়ের দূরত্ব ১০ মিনিটের৷ পথে ছোট ঝর্ণায় গোসল সেরে নেয়া হলো। পানির ঠান্ডার তীব্রতা বুঝতেই আমি ফিরে আসলাম সে পথ থেকে। পাহাড়ের খাঁজে এখানেও যখন বসলাম, চাঁদের অল্প আলোয় দেখছি কুয়াশা জমা রাতের পাহাড়ের সারি। বড় বড় গাছ, নতুন চিকন চাঁদ আর লক্ষ্যাধিক তারার মেলা। পাড়ায় রান্না শেষে খানিকক্ষণ বসে থাকলাম পাহাড়িদের নিজেদের গড়া ফায়ার প্লেসে। এদের রান্নাঘর ঘরের ভেতরেই। রাতে শুকনো কাঠ জ্বেলে রেখে ঘুমোয়, এতে ঠান্ডার তীব্রতা কম অনুভূত হয়। খাবার আইটেম বলতে আমাদের কাছে সুযোগ ৩ রকমের।

১. লাল চালের ভাত, পাহাড়ি দৈতাকার আলুর ভর্তা, ডিম।
২. ভাত, আলু ভর্তা, ঘন ডাল।
৩. ভাত, ডাল, মিষ্টি কুমড়ো ভাজি।

সকালে শুরু ক্রিসতং অভিমুখে যাত্রা। এই প্রথম ব্যাগপত্র সব পাড়াতে রেখেই কেবল নিজেদের নিয়ে যাত্রা শুরু। শতবর্ষী পুরোনো গাছের ছায়া, কড়া রোদ আর পাহাড়ের সবুজের মাঝে দিয়ে হাঁটছি আমরা। একটা সময় উঠে আসলাম আলীকদম থেকে ক্রিসতং মাটির রাস্তায়। শুনলাম, কোন এক ব্যক্তি নিজ উদ্যোগে এ রাস্তা করেছেন যেন কাঠবাহী ট্রাক যাওয়া আসা করতে পারে। এমন এক ট্রাকের পেছনে দাঁড়িয়ে গেলাম কিছু দূর। দেখলাম, ট্রাকে করে এনেছে টিন, বস্তা ভরা লবণ, চাল। আর তুলে নিয়ে যাচ্ছে হলুদ, মিষ্টি কুমড়ো। বিক্রি হবে শহরে। এ রাস্তার বদৌলতে শূণ্য হচ্ছে পাহাড় প্রতিনিয়ত।

এক জুম ঘরে বসে পরলাম সবাই। আড্ডা চল্লো বহুক্ষণ। বন্ধু সিয়ামের নাকি জন্মদিন আজ! পুচু তুলে নিয়ে এসেছিলো পাহাড়ি ফুল, তা দিয়ে পাহাড়ি ঢং য়ে উদযাপন করা হলো জন্মদিন। মুরং প্রতিটি পরিবার দেখলাম স্ব-নির্ভরশীল। সবার ঘরেই আছে তাঁত, জুমের ফসল আর প্রকৃতির ঝিরি সমৃদ্ধ প্রাণ জুড়ানো অঢেল পানি। এই নিয়েই জীবন। নেই কোন চুরির ভয়, নেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা বলতে কিছু। কাঠ সংগ্রহ করে পাহাড় থেকে। সাজায়ে রাখে প্রতিটা উঁচু করে গড়া ঘরের নিচে। শূকর, কুকুরের থাকার জায়গাও এখানেই। শিকার করা হরিণের মাথা ঝুলায়ে রাখে ঘরে। এটা নাকি ঐতিহ্য স্মারক।

স্বল্পবসনে লজ্জা, পর্দা বিহীন সুন্দর ও সরল জীবনের একটা দারুণ দৃষ্টান্ত দেখলাম এখানে। সকল পর্দা যে মনের, আলাপে তা বুঝলাম। এখানে জীবন যেমন সহজ তেমন সকলের প্রতি সম্মানবোধ অগাধ এবং নির্ভেজাল। ঝিরিতে গোসলে নামছেন প্রায় একেবারেই শূণ্যে দেহে। পাড়ার মানুষ, ছোট-বড়, নারী-পুরুষ সকলের চোখেই এটা স্বাভাবিক ও সুশ্রী। চোখের নগ্নতাকে এরা বিসর্জন দিয়েছে বহুকাল এবং বছরের পর পর এভাবেই জীবনধারণে অভ্যস্ত এ সম্প্রদায়। সরল জীবনের এ ধারা বিমোহিত করলো। নিজেরাই বরং লজ্জায় কাতর হয়ে উঠলাম- আমরাই কেবল এভাবে ভাবছি, অথচ পাহাড় উদার ও সভ্য। ফিরতে হবে ঘরে।

২ রাতের পরিকল্পনা এ সরল জীবন শেষ হতেই সবাই সিদ্ধান্ত নিলো আরো একটি রাত কাটাবে এ পাড়ায়। সিদ্ধান্ত হলো আলীকদমেও থাকবো এক রাত গাইড জসিম ভায়ের বাসায়। খাবো বন-মোরগের ঝোল। থানচী-আলীকদম দেশের সর্বোচ্চ মোটরেবল রোড। আমরা পাহাড়, ঝিরি ডিঙ্গিয়ে উঠব ১৩ কিলোমিটার দিয়ে। মোটরবাইকে করে পৌঁছুবো আলীদকম বাজারে। হাঁটতে হাঁটতে আমাদের একদল পথ হারায়ে ঢুকেব পরে অচেনা এক মুরং পাড়ায়। শুনলাম, ওদের দেখেই পাড়া র সবাই ভো-দৌড় ঘরে। ছোট্ট শিশু উঠোনে দাঁড়ায়ে শুরু দিয়েছে কান্না। আতংকিত এ মানুষগুলো হয়তো শহুরে মানুষে অভ্যস্ত না।

আলীকদম পৌঁছে খেতে বসে গেলাম। ততক্ষণে চলে এসেছে ফোনের নেটওয়ার্ক, একের ফোন এক ফোন কল; শহুরে ব্যস্ততা মাথাচারা দিয়ে জানালো ক্যাম্পাস, টিউশন, পকেটের টানাটানা, ইন্টার্ন হাবিজাবি অজস্র ভাবনা। তবে সবথেকে ভয়াবহ লাগতেছিলো শব্দ। সাউন্ড পলিউশন, মানুষের গিজগিজ, অসুন্দর দৃষ্টি আর ঘরের ফেরার তাড়া; সব মিলায়ে সবাই মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলছে এই অসুন্দরের মাঝে আর একটা রাতও না, বরং ফিরে যাই ঘরে। ফিরলাম ঘরে ভোর ৫ টায়। যাত্রা শুরু করেছিলাম সকাল ৮ টায়। মানে আমরা প্রায় একদিন দূরত্বে ছিলাম এই কয়টা দিন। উজ্জ্বল হয়ে থাকবে, স্মৃতিবহ এ ৩ রাত ও ৪ দিনের ‘ক্রিসতং অভিযান’।ফিরতে না ফিরতেই আবার মনে বাজা শুরু হয়ে গেলো ‘কবে যাব পাহাড়ে, আহারে!’

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *