ব্যাড ডিজাইনের কারনে প্রতিবছর বহু মানুষ বহু রোগে আক্রান্ত হয়

জ্ঞান-বুদ্ধির বিবেচনায় মানুষ পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা উন্নত জীব। কিন্তু শারীরিক গঠনের বিচার করলে প্রচুর প্রানী তার চেয়েও উন্নত। বিবর্তনের পথে মানুষ প্রচুর অপ্রয়োজনীয় এবং ক্ষতিকর নকশার শিকার। কারন বিবর্তনে সবসময় উপকারী বৈশিষ্ট্যটাই টিকে থাকে না, মাঝেমধ্যে ব্যাড ডিজাইন দিয়েও পরিবেশের প্রেক্ষিতে টিকে থাকা যায়। কিন্তু এই টিকে থাকা তো ভালো থাকা নয়, ব্যাড ডিজাইনের কারনে প্রতিবছর বহু মানুষ বহু রোগে আক্রান্ত হয়, আয়ু কমে আসে প্রায় অর্ধেকে।

১. অন্ধবিন্দুঃ আমাদের চোখের অপটিক নার্ভ রেটিনাতে এসে মিলিত হয়। সমস্যাটা ঘটে এখানেই। যেই স্পটটায় এরা মিলিত হয় সেই স্পটে না আছে কোণ কোষ আর না আছে রড কোষ। ফলে সেই স্পটটা সম্পূর্ণ অন্ধকার হয় এবং ব্লাইন্ড স্পট বা অন্ধবিন্দু তৈরি হয়।
আমরা সাধারণ জীবনে এটাকে টের পাইনা কারন আমাদের মস্তিষ্ক দেখার জন্য দুটি চোখ ব্যবহার করে এক চোখ অন্য চোখের অন্ধবিন্দু ভরাট করে দেয়। কিন্তু এক চোখ বন্ধ করে এক দেড় ফুট দুরত্বের ক্ষুদ্রকায় বস্তু দেখতে গেলে অন্ধবিন্দুর অস্তিত্ব ধরা পড়ে। অক্টোপাস বা স্কুইডের এরকম সমস্যা নেই। তাদের রেটিনায় অন্ধবিন্দু গঠিত হয়না।

২. দুর্বল মেরুদন্ডঃ আমাদের মেরুদণ্ড প্রধানত ডিজাইনড হয়েছে চার হাত পায় চলার জন্য। কোমরের দিকে হাড় তূলনামূলক সংকীর্ণ যা দেহের ভারবহনের উপযোগী নয়। মেরুদণ্ডের যে হাড় পূর্বে কোমড়ের সাথে আনূভমিক ছিল এবং ৯০ডিগ্রি বাঁকতে পারতো সেই হাড়টার রুপান্তরের কারনেই আজ আমরা হাঁটতে সক্ষম। কিন্তু হাড়গুলো এখনো দেহের ভারবহনের মতো যথেষ্ট পুরু নয় যেকারনে প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ মানুষ পিঠেব্যাথায় ভোগে।

৩. অপ্রয়োজনীয় পায়ের অস্থি ও অস্থিসন্ধিঃ আমাদের প্রতি পায়ে ২৬ টি হাড় রয়েছে। (কোমর থেকে হিসাব করলে ৩০ টি)। আমাদের পূর্বপুরুষদের গাছে চড়তে এসব হাড় এবং সংশ্লিষ্ট অস্থিসন্ধি প্রয়োজন হয়েছিলো। কিন্তু এখন আমাদের হাঁটা/দৌড়ানোর জন্য এতো অস্থিসন্ধির দরকার হয় না। উপরন্তু এই অতিরিক্ত হাড়গুলো ফ্রাকচার, মচকে যাওয়ার মতো অপ্রীতিকর ঘটনা সৃষ্টি করে।

৪. প্রসবনালীর সংকীর্ণতাঃ পূর্বে মানুষের মস্তিষ্ক ছোট ছিলো, মানবশিশুর মাথাও ছোট ছিলো। কিন্তু বিবর্তনে মানবশিশুর মাথার আকৃতি বৃদ্ধি পেলেও বাড়েনি প্রসবনালীর ব্যাস। নর্মাল ডেলিভারিতে ভয়াবহ প্রসবযন্ত্রণার জন্য দায়ী মানবদেহের এই ত্রুটি।

৫. শুক্রাশয়ের অবস্থানঃ মানবদেহের শুক্রাশয় দেহের অভ্যন্তরের সুরক্ষা পায়নি। শুক্রাণু উৎপাদনে শরীরের তুলনায় বেশি তাপমাত্রা প্রয়োজন হয় তা ঠিক কিন্তু এই তাপমাত্রা দেহের ভিতরে ব্যবস্থাপনা না করে শুক্রাশয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গকে শুধুমাত্র একটা পাতলা চামড়ার সুরক্ষা দেয়া যুক্তিসঙ্গত নয়।

৬. আক্কেল দাঁতঃ তিনটি মোলার দাঁতের পর মুখের অভ্যন্তরে যথেষ্ট জায়গা থাকে না যেন আরো একটি দাঁত উঠতে পারে। অতিরিক্ত এই মোলার দাঁতটি উঠতে গিয়ে যেমন যন্ত্রণা সৃষ্টি করতে পারে তেমনি বিভিন্ন সময়ে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। উল্লেখ্য, এস্কিমোদের এই অতিরিক্ত দাঁতের সমস্যা নেই।

৭. কক্কিক্স বা পুচ্ছাস্থিঃ মেরুদণ্ডের সর্বশেষ অস্থিটি কক্কিক্স যা লেজের হাড় নামে পরিচিত। মানব ভ্রূণে এই হাড়টি লেজ হিসেবেই থাকে। তবে সাধারনত ভ্রূণের বয়স ৬ সপ্তাহের পর লেজ অপসারন হয়ে অস্থি হিসেবে থেকে যায়। এই অস্থি কিছু টেনডন লিগামেন্ট ধারন ছাড়া দেহের তেমন কোনো কাজে আসে না তবে কক্কিনিডিয়ার মতো রোগ সৃষ্টি করতে পারে। সেক্ষেত্রে কক্কিক্স দেহের বাইরে অপসারণ করতে হয়।

৮. নিকটিটেটিং ঝিল্লি/ লিকা সেমিলুনারিসঃ কিছু প্রানীর ক্ষেত্রে চোখের এই ঝিল্লিটি চোখ পরিষ্কার ও আর্দ্র রাখতে ব্যবহৃত হয়। কিছু প্রানীর এই ঝিল্লি স্বচ্ছ হওয়ায় তারা পানির নিচে দেখতে এটা ব্যবহার করে। কিন্তু মানবদেহে এটা অপ্রয়োজনীয়।

৯. অরিকুলার পেশিঃ এই পেশি অন্য প্রানীর কান নাড়াতে ব্যবহৃত হয়। অন্য প্রানীরা কান নাড়িয়ে প্রধানত মশা মাছি তাড়ায়, মানুষের এই কাজের জন্য হাতই রয়েছে। একারনে বহু প্রজন্মে দীর্ঘকালীন কান নাড়ানোর প্রয়োজনহীনতার কারনে এই পেশিও মানবদেহে অকার্যকর হয়ে উঠেছে।

১০. খাদ্যনালী-শ্বাসনালী ওভারল্যাপঃ মানবদেহে শ্বাসনালী এবং খাদ্যনালী একটি কমন স্থানে উন্মুক্ত হয় যেটা হল ফ্যারিঙ্কস। খাওয়ার সময় খাদ্য যেনো শ্বাসনালীতে না ঢুকে সেজন্য এপিগ্লটিস শ্বাসনালীকে সাময়িক ঢেকে রাখে। কিন্তু এই এপিগ্লটিস যথেষ্ট দ্রুত নয়। প্রত্যেক মানুষই জীবনে কখনো না কখনো এপিগ্লটিসের ধীরতার শিকার হয়েছে এবং পানি বা খাবারের টুকরা শ্বাসনালীকে গিয়ে কাশির উদ্রেক করেছে। বিরল ক্ষেত্রে এপিগ্লটিসের এই ত্রুটির কারনে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে জীবনও চলে যেতে পারে।

১১. অ্যাপেনডিক্সঃ অ্যাপেনডিক্স দীর্ঘকাল এক বিতর্ক টিকিয়ে রেখেছে এটা সত্যিই উপকারী না অপকারী তা নিয়ে। ধারনা করা হয় অতীতে সেলুলোজ হজমে এটি ব্যবহৃত হতো। কিন্তু সভ্য মানুষ রান্না না করে শস্যজাতীয় খাবার/সবজি খায় না বলে অ্যাপেনডিক্স পরিত্যক্ত হয়েছে। অ্যাপেনডিক্স যে কিছু উপকার করে তাতে সন্দেহ নেই কারন অ্যাপেনডিক্স উপকারী ব্যাকটেরিয়ার আবাসস্থল। তবে আমাদের দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা অ্যাপেন্ডিক্সের ব্যাকটেরিয়াকে আক্রমন করতে পারে এবং সেক্ষেত্রে জীবন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে। অ্যাপেনডিক্স ফুলে বার্স্ট করলে মৃত্যুর সম্ভাবনা অত্যধিক।

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *