চন্দ্রনাথ কে যেভাবে আবরজনার স্তূপ হিসাবে গড়ে তুলছি আমরা

শেষবার ২০১৯ এর মাঝামাঝি একটা সময়ে চন্দ্রনাথে দুইটা দোকান দেখছিলাম। যেখান থেকে দুইটা পথ ভাগ হয়ে গেছে, সেই জলপ্রপাতের আগে একটা। আর চন্দ্রনাথের একদম উপরে একটা। এবার যেয়ে হকচকিয়ে যাবার মতো অবস্থা। বিরূপাক্ষ থেকে চন্দ্রনাথের আগ পর্যন্তই ৩ টা। সব মিলিয়ে ৫ কি ৬ টা। মানুষজন যাচ্ছে আর হাঁপাচ্ছে, এদিকে খুলছে বরফ দেয়া পানি থেকে ওঠানো ঠান্ডা শীতল স্পীড, কোক, স্প্রাইট আর ডিউ। সাথে আছে চিপস। পলিথিন টোকাইতে যেয়ে পেলাম আইসক্রিমের প্যাকেট। একটা দুইটা না, শত শত!

আধুনিক আবর্জনা হিসেবে নিজের চোখে দেখলাম এখানে সেখানে ফেলে আসা মাস্ক। কম করে হলেও অর্ধশতাধিক। বিরূপাক্ষ মন্দির হয়ে আছে এক জ্বলজ্যান্ত ডাস্টবিন হয়ে। এদিকে- ওদিকে চতুর্দিকে শুধুই আবর্জনা আর পানির বোতলে সয়লাব পুরোটা। বিরূপাক্ষের সামনে যেয়েই ভরে গেল প্রত্যেকের হাতে রাখা প্রতিটা বস্তা। উপরের ওঠার আগে মিনিট চল্লিশেক কথা হলো মন্দিরের পুরোহিতের সাথে। ১৫-১৬ বছর ধরে আছেন দায়িত্বে। বললেন, গত ২-৩ বছরের হাহাকারের কথা। মানুষ আসে, মানুষ যায়, মানুষ বোতল ফালায়, মানুষ ব্লুটুথে গান বাজায়, মানুষ উন্মাদনায় নাচানাচি করে, কিন্তু মানুষ ভুলে যায়, এটা একটা মন্দির!

মানুষ ভুলে যায়, পাহাড়ের নৈশব্দের সৌন্দর্য! মানুষ ভুলে যায় নিজের কষ্টের দায় মেটাতে যেয়ে পাহাড়ে বোতল ফেলাটা মানুষের ভবিষ্যতের জন্যেই একটা ভালো না। ভারতের একটা উদাহরণ টানি। মেঘালয়ের খুব চমৎকার ঝর্ণা গুলোর মধ্যে রেইনবো ফলস একটা। প্রায় সবাইই তূর্ণা নেমে নংরিয়াত ভিলেজে যায়, এরপর ওইখান থেকে যায় রেইনবো ফলসে।

২০১৮ তে নংরিয়াত ভিলেজ থেকে রেইনবো পর্যন্ত খুব সম্ভবত দোকান ছিল ২ টা। আমরা নিজেরা যেয়েই রাশিয়ার একটা টিম পর্যন্ত দেখেছিলাম ওখানে, আমরা নিজেরাই তো বিদেশী, সাথে ইন্ডিয়ান পর্যটক তো আছেনই। এতো এতো পর্যটক কিন্তু দোকান কই?
আমার সম্ভবত উচিত হচ্ছে না চন্দ্রনাথের সাথে এখানটার তুলনার দেয়ার। কিন্তু দিচ্ছি বুঝানোর জন্য যে, আমরা ভুল করছি।
আমরা পরিষ্কার করতে গেছিলাম। প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে মানুষ আহবান করে মোট ১২ জন মানুষ মিলে গেছি পরিষ্কার করতে। আমরা জানতাম কোনভাবেই একদম পরিষ্কার করে আসা সম্ভব হতো না। সে দুরাশা একবারের জন্যেও মনে আসে নাই। শুধু চেষ্টা ছিল, যতটুক করা যায়, যতজন পর্যটকের মাঝে ভুলটা ধরিয়ে দেয়া যায়।

আমরা চেষ্টা করেছি কিছু পর্যটকের সাথেও কথা বলতে। জানাতে এবং বুঝাতে। জানিনা কতটুকু কি হয়েছে। হয়তো আগামী শুক্রবারেই যে ১০০০ মানুষ যাবে, ৫ জন করে একটা গ্রুপ গেলেও ২০০ টা পানির বোতলে ছেয়ে যাবে পাহাড়, শ খানেক আইসক্রিমের প্যাকেটে ঢেকে যাবে পুরো ট্রেইল। ব্যক্তিগত সচেতনতা যদি শতভাগও আসে, জানেন, চন্দ্রনাথকে আর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেয়া যাবেনা, যতক্ষণ পর্যন্ত না রিকভারির কোন ব্যবস্থা নেয়া হবে। বিরূপাক্ষের সেই পুরোহিত বললেন, দেখার কেউ নেই। পরিষ্কারের কোন মাথাব্যথা নেই প্রশাসনের।
সবার ফেলে যাওয়া বোতল তারা একটা জায়গায় জড়ো করেন, সেই বোতল মাঝেমধ্যে টোকাইরা এসে নিয়ে যায়, কিন্তু আপনার আমার ফেলা সেন্টার ফ্রুটের প্যাকেট? ফেলে আসা মাস্ক? আইস্ক্রিম আর স্যালাইনের প্যাকেট?

আমি জানিনা, ” প্রশাসন দেখেনা” পুরোহিতের এই কথা সত্য কিনা, কিন্তু অবস্থা চাক্ষুস দেখে আমাদের মনেও এই ধারণা স্পষ্ট হয়ে আছে।
যেখান থেকে দুটো রাস্তা ভাগ হয়ে গেল, ঠিক সেই জায়গাটায় যে দোকানটা, তার অপোজিটে লেখা দয়া করে কেউ প্ল্যাস্টিকের ময়লা ফেলবেন না- আহ্বানে সচেতন এলাকাবাসী! (তার নিচেও যদিও এক গাদা প্ল্যাস্টিক)কিন্তু কোথাও দেখলাম না, প্রশাসন টাইপের কারো সচেতনতা! (কিংবা চোখে কি একবারও পড়ে নি?)আমি ব্যক্তিগত সচেতন হতে নিষেধ করছিনা, বরং সেটাই সবচেয়ে বেশি প্রশংসনীয়, কিন্তু আমাদের দেশের পর্যটন নিয়ে আরো একটু ভাবার বোধহয় সময় এসেছে। একটু ভিন্নভাবে বোধহয় সাজানোর সময় হয়েছে।

দুনিয়া আর আগের সেই অবস্থায় নেই যে, মানুষ জানবে না, যাবেনা, এইভাবে স্রোত আটকানো যাবেনা। হয়তো উচিতও না। এখন সবার হাতে ফেইসবুক, সবার হাতে সুলভ তথ্য প্রবাহের সুযোগ, আপনি কি করে আটকে রাখবেন মানুষকে? দেশের পর্যটন এরিয়াও সীমিত। মানুষ তো যাবেই। তো, এখন বোধহয় আরেকটু বেশি সচেতন হওয়া উচিত দায়িত্বপ্রাপ্ত মানুষদের। নাহলে, চন্দ্রনাথ আর সর্বোচ্চ কয়েকটা বছর টিকে থাকবে। এরপর মাটির রাস্তার বদলে রাস্তা হবে পলিথিনের, প্লাস্টিকের। রাস্তা হবে স্যালাইনের প্যাকেটে। সত্য কথা বলতে আমরা কিছু আশার আলো দেখার জন্যে এই “চন্দ্রনাথ ক্লিনিং- দেশ আমার, দায়িত্ব আমার” ট্রিপটি করেছিলাম, কিন্তু এসেছি এক বুক হতাশা নিয়ে।এই হতাশার দায় আমার। আমাদের। আমাদের সবার। হয়তো পরবর্তী প্রজন্মের কাছে শুধুই ভাগাড় ছাড়া আর কিছুই পৌঁছে দেয়া সম্ভব হবে না।

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *