এই ভ্রমণটা ছিল একেবারেই অন্যরকম (গৌড়ে ২ দিনের দিনলিপি-পর্বঃ ১)

এই ভ্রমণটা ছিল একেবারেই অন্যরকম। সচরাচর আমি ক্যাম্পিং করি অথবা সলো ট্রাভেলিং করি। কিন্তু এবারেরটা একেবারেই অন্যরকম। আমার প্ল্যান ছিল এই সপ্তাহে আমি চাপাইনবাবগঞ্জে একটি সলো ক্যাম্পিং ট্রিপ করব। প্লান মোতাবেক আগে থেকেই ইউনিভার্সিটির ছোট ভাই নাফির সাথে যোগাযোগ করে রেখেছিলাম। বৃহস্পতিবার নাফি নিজেই সকালে আমাকে নক দিল। আমি ভুলে গিয়েছিলাম আজ আমার চাঁপাইনবাবগঞ্জ যাওয়ার কথা। নাফি আবার আমাকে মনে করিয়ে দিলে ঝটপট বাসের টিকেট করে ফেললাম। মনের অলসতা ঝেড়ে ফেলে আবার ভ্রমণের জন্য মন চাঙ্গা হয়ে উঠল।

নাফির পরামর্শমতো বাসের টিকিট করেছিলাম। বাস ছিল রাতে। সারাদিন অফিস করলাম এবং এর ভেতর নাফির সাথে কয়েকবার ফোনে কথাবার্তা হল। আমার পরিকল্পনা ছিল নিস্তব্ধ প্রকৃতির ভেতর অন্তত একটা রাত ক্যাম্পিং করে থাকা কিন্তু নাফি বলল এখন যেহেতু আমের সিজন নাইন তাই এখানে ক্যাম্পিং করাটা খুব একটা নিরাপদ হবে না জুন জুলাইতে আমের মৌসুমে এখানে অনেক লোকজন থাকে নিরাপত্তা কোন সমস্যা হয় না তাই তখন ক্যাম্পিং করা ভালো হবে।

তাই নাফি প্রস্তাব দিল এখন শুধুমাত্র ঘুরে বেড়ানো হোক গরমকালে একটা ক্যাম্পিং করা যাবে। নাফির পরামর্শমতো আমি ছোট্ট একটা ব্যাগ আর এক সেট ড্রেস নিয়ে কল্যাণপুর বাস স্ট্যান্ড এ চলে আসলাম রাত ৯ টায়। আমার শেওড়াপাড়ার বাসা থেকে কল্যাণপুর বাস স্ট্যান্ড ২৫ মিনিটের হাঁটা দূরত্ব। নির্ধারিত সময়েই আমাদের গ্রামীন ট্রাভেলস ঢাকা ছাড়লো। সাভারে ব্রিজের ভাঙ্গনের কারণে একটু জ্যাম হয়েছিল। নির্ধারিত সময়ের এক ঘণ্টা দেরিতে আমরা চন্দ্রা পৌছালাম। চন্দ্রা থেকে কিছু যাত্রী তুলে বাস আবার উড়ে উড়ে চলতে লাগল। এর ভেতরে আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। বাস তুমুল গতিতে সারা রাস্তা ধরে চলতে লাগল। এর ভেতর কয়েকবার নাফির সাথে আমার ফোনে কথা হল। ভোর ছয়টার সময় বাস আমাকে নাফিদের বাসার সামনেই চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাটে পুখুরিয়া মোড়ে নামিয়ে দিল। নাফি বাসা থেকে এসে আমাকে নিয়ে বাসায় গেল। নাফির বাসায় এসে একটু হাত-মুখ ধুয়ে এক গ্লাস পানি খেয়ে হু হু করে কাঁপতে কাঁপতে আমি আর নাফি সোজা লেপের ভেতর। উত্তরবঙ্গের হিমশীতল শীতে কাঁপতে কাঁপতে প্রায় বছর খানেক এর জমানো গল্প আমি আর নাফি সেরে নিলাম। এর ভেতরে ঘণ্টাখানেক ঘুমিয়ে নিয়েছি।

এই শীতকালে উত্তরবঙ্গে সকাল হয় দশটায়। আজ আমার প্রথম দিনের প্লান ছোট সোনা মসজিদ এবং ছোট সোনা মসজিদ স্থলবন্দর সহ নাফিদের আমবাগান, পুকুর এবং ইতিহাস বিখ্যাত কানসাট ঘুরে দেখা। সকাল ৯ টার দিকে সূর্য একটু পুবাকাশে উঁকি দিতেই নাফি আমাকে লেপের ভেতর থেকে টেনে তুলল এবং ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে গেল ডাইনিং টেবিলে। ডাইনিং টেবিলে গিয়ে দেখি আন্টির এলাহি আয়োজন। চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিখ্যাত কালাই রুটি, ধনিয়া পাতা ভর্তা, বেগুন ভর্তা, আদি আদি চমচম এর বিখ্যাত মিষ্টি দিয়ে আন্টি টেবিল সাজিয়ে ফেলেছেন। আমি আর নাফি বসে গেলাম । অনেকটা সময় নিয়েই আমরা দুইজন গলা পর্যন্ত নাস্তা করলাম। এরপর নাফি যোগাযোগ করল নাফির এলাকার ছোটভাই কাম ভাগ্নে সিয়ামের সাথে। প্ল্যান হলো আমি নাফি আর সিয়াম তিনজনে মিলে ছোট সোনা মসজিদ স্থলবন্দর ইত্যাদি এলাকা ঘুরে দেখব। প্লান মোতাবেক নাস্তা করে আমি আর নাফি চলে গেলাম নাফিদের পুরানো বাড়িতে সেখান থেকে নাফির ছোট চাচার মোটরসাইকেলটি নেওয়া হলো, সিয়াম একটু পরে আসবে তাই আমি আর নাফি রওনা দিলাম ছোট সোনামসজিদ এর পথে। ১৬ কিলোমিটার দূরত্বের রাস্তায় দুজনে গল্প করতে করতে রওনা দিলাম। রাস্তা টা অনেক সুন্দর, রাস্তার দু’পাশে আম গাছ আম গাছ। এ যেন আমের গাছের বন। শীতকালে এত সুন্দর দেখে আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম।

ভাবতে লাগলাম না জানি আমের সময়ে এই বনের সৌন্দর্য কেমন হয়। আমি আর নাফি টুকটুক করে গল্প করতে করতে এগুতে লাগলাম । একপাশে পাগলা নদী তার উপরে আম বাগান আর বাগানের মাঝখান দিয়ে সোজা পাকা রাস্তা চলে গেছে সোনামসজিদ। চারিদিকে শুধুই আমগাছ মাইলের পর মাইল শুধু আম গাছের গুড়ি আর বিস্তীর্ণ জমি। দেখলে মনে হয় এটা যেন সুন্দরবনেরই স্থলভাগ যেন এটা ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট এর মতই কোন একটা স্থান। এই আমবাগানে অদ্ভুত নীরবতা, গাছে গাছে পাখির ডাক, কুয়াশাঘেরা দিনে নির্জন নির্জনতা কোথাও কোনো মানুষ নেই মাইলের পর মাইল নিস্তব্ধ প্রকৃতি।

দেখতে দেখতে আমরা ছোট সোনামসজিদ এসে পৌছালাম। প্লান মোতাবেক নাফি আমাকে নিয়ে গেল তোহাখানায়। এখানে একটি মসজিদ, শাহ সুজার বিশ্রামখানা, একটি বিরাট দীঘি এবং শাহ নেয়ামত উল্লাহ নামে একজন সুফি ব্যক্তি তার পরিবার-পরিজন এবং অনুচরদের মাজার রয়েছে। পৌরাণিক গল্প মতে এখানে একটি পাথর আছে যেটি প্রতিবছর একটু একটু করে বড় হয়। আমরা স্থানীয়দের কাছে সেই পাথরের খোঁজ করলাম, কিন্তু কেউ কোন সদুত্তর দিতে পারলোনা। গল্প করতে করতে শীতের সকালে একটু একটু করে হাঁটতে হাঁটতে আমি আর নাফি মুঘল বাদশাহ দের এই অনিন্দ্যসুন্দর স্থাপত্য কৌশল দেখতে লাগলাম। এটা নাফির বাড়ির কাছে তাই ও নাকি প্রায়ই আসে কিন্তু আমি এবার প্রথম এসেছি। আমি ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থানে মুঘল স্থাপত্য দেখে অভ্যস্ত বলে নাফিকে বুঝিয়ে বললাম এটা মুঘলদের শেষ সময়ে তৈরি এবং খুব কম টাকা পয়সা খরচ করে তৈরি কারণ মুঘল সম্রাটরা বিদেশি দামি পাথরের মার্বেল পাথরের স্থাপত্য খুব পছন্দ করে সেই তুলনায় এই স্থাপত্য একেবারেই সাধারণ।

মাটির নিচে ঘরসহ প্রতিটা ঘরের আনাচে-কানাচে আমি আর নাফি গল্প করতে করতে হেটে বেড়াচ্ছিলাম। আমরা কল্পনা করতে লাগলাম সেই সময়ের মানুষগুলো কি করত এই ঘরের এই কোনায় কোনায়, তারা কিভাবে এখানে বসবাস করত, কিভাবে খাওয়া-দাওয়া করত, এখানে তাদের লাইফস্টাইল এসব নিয়ে আমরা আলাপ করতে থাকলাম। তোহাখানা আমাদের দেখা শেষ হতে হতেই নাফির ছোট ভাই সিয়াম চলে আসল। আমরা তিনজন মিলে রওনা দিলাম দারাসবাড়ি মসজিদ মাদ্রাসা দেখতে। এটা শুধুমাত্র দুই পাশের দেয়াল এবং পাশে একটা পুকুর, আহামরি তেমন কিছু নয়, প্রায় ধংশস্তুপ। খুব অল্প সময়ে এই মসজিদটি আমাদের দেখা শেষ হয়ে গেল এটিও মুঘল স্থাপত্যের একটি নিদর্শন। এটি দেখে আমরা তিনজনে গেলাম পাগলা নদী এবং সীমান্তবর্তী একটা সেতু দেখতে। এখান থেকে সীমানা এবং আমাদের মাঝে ব্যবধান শুধুমাত্র শীর্ণকায় পাগলা নদী। নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে আমরা ভারতের মালদহ জেলার ভুখন্ড দেখতে পেলাম। চাঁপাইনবাবগঞ্জের ওপারেই ভারতের মালদহ জেলা অবস্থিত। স্থানীয় একজন মানুষের কাছ থেকে আমরা ব্রিজ এবং এলাকার কিছু ধারণা নিলাম। তারপর আমরা তিনজন মোটরবাইক ঘুরিয়ে চলে আসলাম দারাসবাড়ি মাদ্রাসা দেখতে। প্রায় ৪০ কক্ষ বিশিষ্ট একটি মাদ্রাসা ছিল এটি। প্রতিটা ঘর আলাদা আলাদা ছোট ছোট একজন মানুষের থাকার মতো উপযোগী করে বানানো ছিল, উপরের ছাদ এখন আর অবশিষ্ট নাই শুধুমাত্র চিহ্ন গুলো বোঝা যায়। মাদ্রাসার মাঝখানেই একটি ঘরের এখানে মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক থাকতেন।

সিয়াম বলল এই মাদ্রাসার আকৃতিতে রাজশাহীর প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগোটি হয়তো তৈরি করা । দারাস বাড়ি মাদ্রাসা দেখে আমরা রওনা দিলাম সোনামসজিদ স্থলবন্দর দেখতে। বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্থলবন্দরটির আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বর্তমানে করোনাভাইরাস এর কারণে সীমিত ভাবে চলছে। আমরা জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত হেঁটে গেলাম যেখান থেকে আর যাওয়া নিষেধ। এখানে আমি সিয়াম আর নাফি কিছু কিছু ছবি তুললাম। এখানে আমরা একটা ভ্যান থেকে ডাব কিনে খেলাম। ছুটির দিন হওয়ায় বেশ কিছু মানুষ আশপাশ থেকে বেড়াতে এসেছে। এছাড়া এই স্থানটি চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ আশেপাশের কয়েক জেলার বেশ জনপ্রিয় ভ্রমণ স্থান। আশপাশের জেলা সহ বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রচুর মানুষ এখানে পিকনিকসহ ভ্রমনে আসে। এখান থেকে আমরা গেলাম চামাচিকা মসজিদ দেখতে। সবগুলো মসজিদ এর সাথে একটি করে বড় পুকুর আছে। সবগুলোই মুঘল আমলে একইসাথে তৈরি। চামাচিকা মসজিদে এসে আমরা নামাজ পড়লাম। এই মসজিদটিতে এখনো জুম্মার নামাজ সহ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের ব্যবস্থা আছে। এসব স্থাপনাগুলো অনেক আগেই ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল, পরে প্রত্নতত্ব অধিদপ্তর এগুলা সংস্কার করে নামাজ পড়ার ব্যবস্থা করেছে এবং দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছে। নামাজের পর চামচিকা মসজিদ ঘুরেফিরে দেখে আমরা রওনা দিলাম ধনায়চক মসজিদের দিকে। আম বাগানের ভেতর দিয়ে আমরা মোটরবাইকে করে করে মানুষের মুখে মুখে নির্দেশনা শুনতে শুনতে এগোতে লাগলাম। এখানে সভ্যতাও আম বাগানের ভেতর, রাস্তা বাগানের ভেতর, সবকিছুই এখানে আমবাগান কেন্দ্রিক।

আম বাগানের ভেতরেই খুঁজে পাওয়া গিয়েছে এই মসজিদ। প্রত্নতত্ব অধিদপ্তর এই মসজিদটিও সংস্কার করে মানুষের নামাজ পড়ার জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছে। আমরা এ মসজিদটির চারপাশ অনেকক্ষণ সময় নিয়ে ঘুরে ঘুরে দেখলাম। দেখে আমরা রওনা দিলাম আমাদের মূল ভ্রমণ স্থান ছোট সোনা মসজিদ। এটি সোনামসজিদ স্থলবন্দর এর দিকে আসার পথে ডান হাতে প্রধান সড়কের পাশে অবস্থিত এবং আমরা এটিকে সবার শেষে দেখে বাড়িতে ফিরবো পরিকল্পনা করেছিলাম। সেইমতো সবশেষে আমরা ছোট সোনা মসজিদ প্রাঙ্গণে চলে আসলাম। এখানে সম্ভবত কোনো একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি চলছিল বিধায় মানুষজন ছিল। এই সেই বিখ্যাত ছোট ছোট সোনা মসজিদ, এই প্রাঙ্গণে আমাদের একজন বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের কবর অবস্থিত। মোটরসাইকেল রেখে ঘুরে দেখলাম মসজিদের ভেতরে, পুরনো আমলের সিঁড়ি দিয়ে মসজিদের ছাদে উঠে দেখলাম। কিছুক্ষণ পর রাজনৈতিক কর্মসূচি শেষে সবাই চলে গেলে আমরা বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের কবর পরিদর্শন করলাম । একই কবরের পাশেই সেক্টর কমান্ডার মেজর নাজমুল এর কবর অবস্থিত যিনি মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছিলেন।

পাশাপাশি কবরে একজন বীরশ্রেষ্ঠ এবং একজন সেক্টর কমান্ডার শুয়ে আছেন। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম দুই শ্রেষ্ঠ সন্তান দের কবর পরিদর্শন শেষে আরও কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে পথে এক দোকানে একটা বিখ্যাত স্পঞ্জের মিষ্টি খেয়ে আমরা বাড়ীতে ফিরলাম। বাড়ি ফিরে শাওয়ার নিয়ে আমি আর নাফি খেতে বসলাম, খাওয়া করেই আমরা আবার সোজা লেপের ভেতর। অনেকক্ষণ বসে গল্প করতে করতে বিশ্রাম নিলাম । বিশ্রাম নেওয়া শেষ করে আমি সিয়াম আর নাফি আবার মোটরবাইকে করে বের হলাম চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিখ্যাত কালাই রুটি আর হাঁসের মাংস খেতে। রাতে হাঁসের মাংস কালাই রুটি দিয়ে ডিনার করে আমরা বাসায় ফিরলাম বাসায় ফেরার পথে কানসাট হাই স্কুলের সামনে এক দোকানে ডাবল হিট এর চা খেলাম, ফটোসেশন করলাম। রাতে বাসায় ফিরে লেপের ভেতর শুয়ে শুয়ে অনেকক্ষণ আমাদের বিগত এক বছরের জমানো ভার্সিটির গল্প, ব্যক্তিগত গল্প, পারিবারিক গল্প গল্প করতে লাগলাম। আমাদের রাত যেন গল্পে গল্পে ফুরায় না তবুও একটা সময় পর ক্লান্ত হয়ে আমরা ঘুমিয়ে পড়লাম। এভাবেই আমাদের কানসাট ভ্রমণ এর ১ম পর্ব শেষ হলো। আগামীকাল আমাদের প্ল্যান আমরা নাচোলের টিকয়ল গ্রামে যাব যার আরেক নাম বিখ্যাত আলপনা গ্রাম ।

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *