এই ভ্রমণটা ছিল একেবারেই অন্যরকম (গৌড়ে ২ দিনের দিনলিপি-পর্বঃ ২)

চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমাদের দ্বিতীয় দিনের প্ল্যান ছিল আমরা নাচোলের বিখ্যাত আলপনা গ্রাম অর্থাৎ টিকোইল গ্রামে ঘুরতে যাব। সেই মতে আগের দিন রাতেই যত রাজ্যের গল্প শেষ করে আমি আর নাতি ঘুমিয়েছি। রাতে ঘুমটা ভালই হয়েছে কারণ আগের দিনের সারাদিনের ঘোরাঘুরি, আগের রাতের বাসে জার্নি সকাল এবং দুপুরের নাফির আম্মুর অর্থাৎ আন্টির ব্যাপক রান্নাবান্না দ্বারা ভুরিভোজ এবং রাতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিখ্যাত কালাই রুটি এবং হাঁসের মাংসের দিনার এসব খেয়ে রাতে ঘুমটা ভালো হওয়ার কারণে দ্বিতীয় দিনে আমাদের ঘুম ভাঙতে একটু দেরি হলো। প্রায় ৯ টার দিকে ঘুম থেকে উঠে একটু হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে আবার বসলাম নাস্তা করতে। আন্টির হাতের জাদু দেখা গেল এদিনেও। নাস্তায় ছিল কালাই রুটি, মুরগির মাংস ঝোল, মিষ্টি চমচম, ছানার জিলিপি এবং সবজি ভাজি। আন্টির হাতের নাস্তা দিয়ে পাকস্থলী ভরে আমি আর নাফি বের হলাম নাচলের পথে।কানসাট বাজার থেকে সিএনজি করে গোমস্তাপুর, রহনপুর ইত্যাদি এলাকা পার হয়ে আমের রাজ্য ছাড়িয়ে আমরা আস্তে আস্তে প্রবেশ করলাম বরেন্দ্র এলাকায়।

মূলত বরেন্দ্র ভূমি সংলগ্ন এলাকার এদিকে আমের চাষ হয় কম তবে অন্যান্য বরেন্দ্র এলাকায় মত এখানে প্রচুর পরিমাণে শাকসবজি এবং অন্যান্য ফসল ফলে। সবুজ প্রকৃতি দেখতে দেখতে আমরা প্রায় এক ঘন্টা পর নাচোল বাজারে এসে হাজির হলাম। এখান থেকে আমাদের সাথে যোগ দিল নাফির আত্মীয় ছোট ভাই বাবু এবং তার বন্ধু। ওদের সাথে নিয়ে স্থানীয় একটা মিষ্টির দোকান থেকে চা কফি খেয়ে আমরা একটা অটো ভ্যান নিলাম। ততক্ষণে দুপুর গড়িয়ে চলে গেছে একটা বাজে প্রায়। নাচোল রাজশাহী মহাসড়ক ধরে আমাদের ইঞ্জিনভ্যান এগিয়ে চলতে লাগল টিকোইল গ্রামের দিকে। এদিকে প্রচুর প্রচণ্ড ঠান্ডায় আমি সহ অন্যরা হুহু করে কাঁপতে লাগলো। নাফি আমাকে বলেছিল চাঁপাইনবাবগঞ্জের কাছে আসার আগে ভালোমতো শীতের কাপড় নিয়ে আসতে। কিন্তু শীতকালে যেহেতু আমার হাফপ্যান্ট পড়ে ঘোরাঘুরি করা অভ্যাস তাই আমি হয়তো উত্তরবঙ্গের শীত কে একটু অবহেলায় করেছিলাম, একটু আন্ডারএস্টিমেট করেছিলাম। সেটা শাস্তি পেতে লাগলাম উপরে চারটি কাপড় পড়ার পরও আমি শীতে হু হু করে কাঁপতে লাগলাম। কাপতে কাঁপতে গ্রামের দিকে আমরা আমরা এগুতে লাগলাম। প্রায় ৩০ মিনিট চলার পর আমরা টিকোইল গ্রাম এসে হাজির হলাম। আসলে যে এক্সপেক্টেশন নিয়ে গ্রামটিতে আসা যে পুরো গ্রামের প্রতিটি ঘরে ঘরে আমরা দেখব আলপনা, প্রতিটি মানুষ আলপনা নিয়ে ব্যস্ত, সবসময় আলপনা করতেছে, এগুলো নিয়ে তারা বিজি আসলে সেরকম কিছুই আমরা দেখলাম না। আলপনা গ্রামের সূত্রপাত হয়েছিল আসলে স্থানীয় একজন গৃহিণী দেখন বর্মন এর হাত দিয়ে।উনার তিনটি কন্যা আছে কোন ছেলে নাই, উনার স্বামী বেঁচে নাই।

উনি যখন এই বর্মন পরিবারে গৃহিণী হিসেবে আসেন তখন এই গ্রামটি ছিল পুরোপুরি মাটির ঘরবাড়ী দ্বারা বেষ্টিত। আসলে পুরো বরেন্দ্র অঞ্চলে আমরা মাটির ঘরের ব্যাপক আধিক্য দেখেছি, এমনকি কোনো কোনো মাটির ঘর দোতলা তিনতলা পর্যন্ত। দেখন দিদিমা যখন বর্মন পরিবারের গৃহিণী হিসেবে আসেনি মাটির ঘর মাটি দিয়ে কিভাবে সুন্দর করা যায় সেসব ভাবতেন সবসময়। তখনই মাটির রং, গাছের বিভিন্ন নির্যাস থেকে সংগৃহীত বিভিন্ন রং সংগ্রহ করে উনি ঘরের দেয়ালে দেয়ালে আলপনা আঁকা শুরু করেন। এরপর নাগরিক জীবনের মানুষেরা উনার সৃষ্টি কর্ম আবিষ্কার করে, উনাকে আবিষ্কার করে এবং তারপরেই গ্রামের সবাই আস্তে আস্তে উনার দেখাদেখি তাদের ঘরে আলপনা আঁকা শুরু করে। এখন ঘরের অধিকাংশ বাড়ির ভেতরে সবারই আলপনা করা আছে। আমরা কিছু দোতলা ঘরের কার্নিশে দেখলাম মাটির পাত্র ঝুলানো। একজনকে জিজ্ঞাসা করতে উনি বললেন এখানে কবুতর পোষা হয়। আমরা দেখন দিদিমার বাড়িতে ঢুকলাম। উনারা কেবল সকালের খাবার খেয়ে শেষ করেছেন। উত্তরবঙ্গের শীতে সকাল ই হয় দুপুরবেলা। আমরা অনুমতি নিয়ে বাড়িতে ঘুরে ঘুরে দেখলাম, ছবি তুললাম তারপর দিদিমা এবং নাতি নাতনীদের সাথে আড্ডায় মেতে উঠলাম।

আমি নানান রকম প্রশ্ন করে সম্পর্কে আলপনা আঁকার শুরু সম্পর্কে জেনে নিলাম। কথাপ্রসঙ্গে আমি জেনে নিলাম উনার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বংশধরেরা ইতোমধ্যে আলপনা আঁকা শুরু করেছে এবং বর্তমানে তারা বেশিরভাগ আলপনা করে থাকে।বর্তমানে দিদিমা শারীরিকভাবে অসুস্থ বিধায় শুধু নির্দেশনা দেন এবং সহযোগিতা করেন। উনাকে বিভিন্ন পুরস্কার সহ সরকারের পক্ষ থেকে একটি বাড়িও করে দেওয়া হয়েছে সেই বাড়ির প্রতিটি দেয়ালে আলপনা। অনেকক্ষণ গল্প করলাম উনার কাছ থেকে আমরা আলপনা আঁকার সমস্ত ইতিহাস জেনে নিলাম। গল্পের ফাঁকে ফাঁকে উনি একটু অভিযোগ করলেন। উনি বললেন মাঝে মাঝে ভ্রমণকারীরা এসে উনাদের বেশ বিরক্ত করে, কেউ কেউ আলপনা নষ্ট করে ফেলে। উনাদের খাওয়ার সময় দেন না এবং বিভিন্ন রকম হবে ছবি তোলার জন্য বিরক্ত করেন। আমরা সেসব ভ্রমণকারীদের পক্ষ থেকে উনার কাছ থেকে ক্ষমা চাইলাম, এবং উনার সাথে আমরা বেশ কিছু ছবি তুললাম।

ছবি তোলা শেষ করে আমরা আলপনা গ্রামটিতে হাঁটতে বের হলাম। আমরা বাড়িগুলোর কার্নিশে পাখি, কবুতর ইত্যাদি পোষার জন্য পাত্র গুলো দেখলাম। একটা স্থানে একটি শতবর্ষী তেঁতুলগাছ দেখলাম। সবকিছু দেখা শেষ করলাম। আসলে যে এক্সপেক্টেশন নিয়ে আমরা আলপনা গ্রামে গিয়েছিলাম বা পর্যটকরা যেভাবে ভাবেন দূর থেকে জল্পনা গ্রামটি না জানি কি আসলে এতটা কি সোনা ওভাররেটেড নয় তবে আহামরি কিছু নয়। ফেরার পথে আমরা একটা সরিষা ক্ষেতে নামলাম, কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করলাম, কিছু ছবি তুললাম তারপর আবার একই পথ দিয়ে নাচোল বাজারে এসে হাজির হলাম। বাজারে এসে ভ্যান ছেড়ে দিয়ে আমরা নাচোলের বিখ্যাত পাতার মিষ্টি খেয়ে দেখলাম। বাবু এবং তার বন্ধুকে বিদায় দিয়ে আমি আর নাফি আবার কানসাট গামী সিএনজিতে চড়ে বসলাম।

বিকাল ৫ টার দিকে আমি আর নাফি কানসাট এসে পৌঁছলাম । সেখান থেকে সোজা নাফির বাসায়। ওখানে একেবারে দুপুর এবং রাতের খাওয়া খেয়ে, রাতে আমার বাসের টিকিট করা ছিল কানসাট থেকে ঢাকা। রাত দশটার বাসে আমি কানসাট থেকে ঢাকার দিকে রওনা দিলাম। ভোর পাঁচটায় বাস আমাকে কল্যাণপুর বাস কাউন্টারে নামিয়ে দিলো আর এভাবেই শেষ হলো আমার দুই দিনের চাঁপাইনবাবগঞ্জ ভ্রমণ। নাচোলে কি কি দেখবেন-

নাচোল আসলে চাঁপাইনবাবগঞ্জের একটি ছোট্ট উপজেলা। আপনারা দেখতে পারেন বিখ্যাত তেভাগা আন্দোলনের নেত্রী ইলা মিত্রের শ্বশুরবাড়ি যদিও এখন সেখানে তেমন কিছু নয় শুধুমাত্র একটি মন্দির এবং ইলা মিত্রের শ্বশুরকূলের কিছু ধনসম্পত্তি এবং জমিজমা। আলপনা গ্রাম যাওয়ার পথে একটি কৃত্রিম পার্ক পাবেন সময় পেলে সেখানে ঘুরে আসতে পারেন।

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *